হযরত খানজাহান (রঃ) এর মাজার

ষাট গম্বুজ মসজিদ সহ এ অঞ্চলের প্রতিষ্ঠাতা ‘খান-উল-আযম উলুঘ খান-ই-জাহান (রঃ)’ ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং তৎকালীন স্থানীয় শাসক।

বাগেরহাট জেলা সদর থেকে প্রায় ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ষাট গুম্বজ মসজিদ হতে প্রায় ২.৫ কি:মি: দক্ষিণ-পূর্বে খানজাহান (রহ:) এর খনন কৃত ‘খঞ্জালী দীঘি’ বা ‘খানজাহান আলী দীঘির’(ঠাকুর দীঘি) উত্তর পার্শ্বে অবস্থিত হযরত খান-ই-জাহান (রহ:) এর মাজার শরীফ। খান-ই-জাহান দীঘির প্রধান ঘাট হতে উপরে উঠতে একটি বেষ্টিত প্রাচীররে (দেওয়াল) ভেতরে সুন্দর এক গুম্বজ বিশিষ্ট ইমারতটি হয়রত খানজাহান (রহ:) এর মাজার ভবন।

চতুষ্কোণ বিশষ্টি বর্গাকার মাজার শরীফের বাহিরের মাপ ৪৬x৪৬ ফুট। সমতল হতে গম্বুজের উপরিভাগ প্রর্য়ন্ত মাজার ভবনের উচ্চতা আনুমানিক ৪৭ ফুট। খানজাহান (রহ:) এর নির্মিত মসজিদ গুলরে ন্যায় তার মাজারের ভবনের চারকোনেও রয়েছ ৪টি গোলাকার বুরুজ/স্তম্ব (Tower)। মাজার ভবনের ভেতরে ধূসরবণের পাথর দ্বারা আবৃত করা রয়েছে হযরত খানজাহান (রহ:) কবর। যার উপরিভাগ অর্ধ-গোলাকার এবং লম্বায় প্রায় ৬ ফুট। ষাট গম্বুজ মসজিদ তৈরীতে যে পাথার ব্যাবহার করা তাও একই ধরনের। কথিত আছে যে, হযরত খানজা-ই-জাহান (রহ:) এ সকল পাথর চট্টগ্রাম থেকে আনতেন। মাজার ভবনের দক্ষিন, পূর্ব ও পশ্চিমে দেওয়ালে ৩টি দরজা। দরজা গুলির বিস্তৃতি ৬.১০ ফুট। বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিমে দরজা দু’টি লোহার গেট দ্বারা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কররের আচ্ছাদনটি (করবাচ্ছাদনটি) তৈরিতে ব্যবহৃত পাথরে চমৎকার ক্যালিগ্রাফির উৎকীর্ণ রয়েছে। এখানে আরবি ও ফারসি ভাষ্যে কালিমা, মহান আল্লাহর নিরানব্বই টি নাম, খেঅলেফায়ে রাশেদিনের নাম, কোরা’ন শরিয়ের আয়াত, ফারসি কবিতা এবং খান-ই-জাহানের উপদেশাবলী সহ মৃত্য ও দাফনের তারিখ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। স্থানীয়ভাবে ‘খানজাহান আলীর মাজার‘ নামে পরিচিত হলেও এখানে ইমারতটির ভিতরে অবস্থিত কবর ফলকটিতে “খান-উল-আযম উলুঘ খান-ই-জাহান” পদবির উল্লেখ হয়েছে। কিন্তু এই পদবির সাথে জড়িত ব্যক্তির নাম উল্লেখ নেই। সাধারণ মানুষ পদবিটির একটি অংশ ‘খান-ই-জাহান’ কে নাম ধরে এর সাথে ‘আলী’ যোগ করেছেন। যদিও এটি সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত নাম। আবার কোন কোন লেখক দীর্ঘ দিনের গল্প-কাহিনীর উপর ভিত্তি করে এই ‘খানজাহান আলী’কে একজন পীরের আসনে তুলে ধরেছেন।

হযরত খানজাহান (রাঃ) এর মাজারের প্রথম দরজা দিয়ে ঢুকেই তাঁর পায়ের সুন্দর গেলাপে আবৃত শিলালিপিতে লেখা আছে তার মৃত্যু তারিখ। শিলালিপি অনুযায়ী ২৬শে জিলহাজ্ব ৮৬৩ হিজরী তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন এবং ২৭শে জিলহাজ্ব (২৪-২৫ অক্টোবর, ১৪৫৯ খ্রি.) তাঁকে সমাধিত করা হয়। ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাজ রত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়।

খানজাহান (র:) এর সমাধির পশ্চিম দিকে (পশ্চিম দরজার সামনে) মাজার ভবনের বাইরে রয়েছে পীর আলি মোহাম্মদ তাহেরের সমাধি। পীরালী মোহাম্মদ তাহের ছিলেন খানজাহান এর উজীর অর্থাৎ খলিফাতাবাদ এর প্রধান মন্ত্রী। তার কবর টিও খানজাহান আলীর ন্যায় ধূসরবণের পাথর দ্বারা আবৃত করা। মাজার প্রাঙ্গনে পীর আলি মোহাম্মদ এর সমাধী ছাড়াও দরগাহ মসজিদ, খানজাহান (রহ:) এর বাবুচিখানা সহ তার কয়েক জন ঘনিষ্ঠ অনুসারীর কবর রয়েছে।

.


© সুব্রত কুমার মুখার্জী, সামছউদ্দীন-নাহার ট্রাস্ট।