বেগম রেশাতুন নাহার
স্বামী : মরহুম সামছউদ্দিন আহম্মদ
পিতা : মরহুম খান সাহেব নেয়ামুদ্দিন সরদার
মাতা : মরহুম সৌরভজান বিবি

রেশাতুননাহার বর্তমানের সাতক্ষীরা জেলার অন্তর্গত বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে ১৯২৯ সালে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা ছিলেন তদানীন্তন খুলনা জেলার একজন অত্যন্ত সৎ ও সফল ব্যবসায়ী এবং কর্মী পুরুষ। নানা ধরনের সমাজ সেবায় অবদানের জন্য ইংরেজ সরকার তাকে ‘খান সাহেব’ পদবিতে ভূষিত করে। খান সাহেব নেয়ামুদ্দিন সরদার বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলের এক অতি পরিচিত নাম। সকল কৃতী মানুষের ন্যায় তাঁর কর্মকান্ড কলিকাতা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়ে। তিনি সপরিবারে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। লেখাপড়ার প্রতি তিনি ছিলেন অত্যন্ত উৎসাহী। নিজ-গ্রামে তিনি একটি নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। সুতরাং স্বাভাবিক যে, তিনি তার সন্তাদের সুশিক্ষার ব্যবস্থা করতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন।

রেশাতুননাহারের মা ছিলেন সৌরভজান বিবি। খান সাহেব নিয়ামুদ্দিন সরদার তাঁর কন্যা সন্তাদেরও চেয়েছিলেন সুশিক্ষিত করে তুলতে। তিনি মরহুম সামছউদ্দীন আহম্মদকে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করতে মনস্থ করেন। জনাব সামছউদ্দীনম্মআহমদের বড়ভাইও তখন কলকাতায় থেকে লেখাপড়া করছেন।জনাব আহম্মদের পিতা একজন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক। তার পক্ষে দুই ছেলের লেখাপড়ার ব্যয়ভার নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খান সাহেব তাকে গৃহ শিক্ষকের প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাব জনাব আহম্মদের কাছে অত্যন্ত সময়োপযোগী মনে হয়। এই পরিচয়ের, যাওয়া-আসার সূত্র ধরেই ১৯৩৯-এর শেষের দিকে রেশাতুন নাহারের জনাব সামছউদ্দীন আহম্মদের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হয়।

বিবাহের অল্প কিছু কাল পরেই শুরু হয় রেশাতুন নাহারের সংসার জীবন। স্বামী ততদিনে সরকারি চাকুরিতে যোগ দিয়েছেন। রেশাতুন নাহারকে পিত্রালয়ের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রায় বালিকাবেলা ছেড়ে পাড়ি দিতে হল শ্বশুরালয়ের উদ্দেশে। শ্বশুর তেমন অবস্থাপন্ন নন, স্বামীর বেতনও যৎসামান্য। তাছাড়া, যে কোন নববধুর পক্ষে অচেনা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে প্রথম-প্রথম মানিয়ে নেয়া দুরূহ। সে তো তার জন্য এক নতুন দেশ, সেখানে শেকড় গাড়তে হয়েছে রেশাতুন নাহারকে।

মুখের ভাষার পার্থক্য, আচার-ব্যবহারের পার্থক্য ইত্যাদির কারণে মাঝেমধ্যে বিব্রতও হতে হয়েছিল তাকে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে সুগৃহিণীর মর্যাদা জুড়ে যায় তার ভাগ্যে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ১৯৪৩-এ জন্ম নেয় তার প্রথম সন্তান। ছেলে সন্তানের মুখ দেখে নিশ্চয় খুশি হয়েছিল সবাই। তখন সমাজে সেটাই ছিল রীতি বা রেওয়াজ। মায়ের সম্মানও বেড়ে গেল কিছুটা। শ্বশুর অসুস্থ হয়ে পড়েন, শাশুড়িরও বয়স তখন বেশ।

রেশাতুন নাহারকে দীর্ঘকালই গ্রামে থেকে যেতে হয়েছিল। ১০-১১ বছরের মধ্যেই জন্ম নেয় আরও তিনটি সন্তান। সবকটিই ছেলে। ছেলেরা বড় হয়ে উঠছিল, সঙ্গে-সঙ্গে দুরন্তও। গ্রামে লেখাপড়ারও সুবিধা নেই। অগত্যা, মূলতঃ সন্তানদের লেখা-পড়ার সুযোগ-সুবিধার জন্য রেশাতুন নাহারকে চলে আসতে হলো স্বামীর কর্মস্থল পিরোজপুরে। স্বামীর বেতন তো সামান্যই, তার ওপর শ্বশুর অসুস্থ, খরচ যোগাতে হয় তার চিকিৎসারও। ছেলে-স্বামীসহ রেশাতুন নাহারকে সংসার পাততে হলো দু’কামরার খোয়া-ওঠা ভাঙ্গা বাড়িতে। সেখানেই জন্ম হল প্রথম কন্যার।

স্বামীর বদলির চাকরি। স্বামীর সঙ্গেই ঘুরতে হল পিরোজপুর থেকে বরিশাল, বরিশাল থেকে খুলনা, খুলনা থেকে বগুড়া, অবশেষে বগুড়া থেকে ঢাকা। এরই মধ্যে সারতে হয়েছে শ্বশুরের-শাশুড়ির সেবা-শ্বশ্রুষার দায়। মাঝে-মধ্যেই যেতে হয়েছে গ্রামে। ইতোমধ্যে কোলজুড়ে এসেছে আরও দুটি ছেলে এবং একটি কন্যা। মাঝে মারা গিয়েছে একটি শিশু সন্তানও। সে অসহ্য বেদনাও মনে করতে হয়েছে রেশাতুননাহারকে। শ্বশুরের মৃত্যুর কিছুকাল পরে শয্যাসায়ী হয়ে পড়েন শাশুড়ি। স্বামীর পদোন্নতি হয়েছে কিন্তু আয় বা বেতন বাড়েনি তেমন। তিনি ছিলেন খ্যাতিমান সফল শিক্ষক। তার ধ্যানজ্ঞান ছিল ছাত্রছাত্রীদেরকে পাঠদান। বাড়তি আয় বলতে কিছুই ছিল না সংসারে।

আত্মীয়স্বজন পাড়াপড়শি পাঠিয়ে দিত তাদের সন্তাদেরকে সামছউদ্দীন আহম্মদ-এর কাছে। তারা আস্তানা গেড়ে বসত রেশাতুননাহারের সংসারে। ভার বইতে হত তাকেই। আপন সন্তানরাও ততদিনে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী। ভাই-বোন পিঠাপিঠি সবাই, কারোরই চাকরি নেয়ার প্রশ্ন ওঠেনি। খরচও বেড়ে গিয়েছে প্রচুর। পুরোটাই সামাল দিয়েছেন রেশাতুননাহার। কি ভাবে যে দিয়েছেন, একমাত্র তিনিই জানেন। ১৯৭১-এর পরে সন্তাদের কেউ-কেউ আয় রোজগারের মুখ দেখতে শুরু করে। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। ছেলে মেয়েরাও একে একে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

২০০২ সালে জনাব সামছউদ্দীন আহম্মদের মৃত্যুর পর তিনি গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত লোকদের উন্নয়নের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কম্পিউটার শিক্ষার কর্মসূচী গ্রহন করেন। নিজেরই গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন “সামছউদ্দীন-নাহার ট্রাস্ট”। তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ট্রাস্ট-এর আওতায় গরীব শিশু-কিশোরের শিক্ষা, প্রসূতির সুচিকিৎসা ও কম্পিউটারে জ্ঞান দানের কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। অত্যন্ত সার্থক রূপে ট্রাস্টের কর্মকাণ্ডে পরিচালিত হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে জেলাজুড়ে প্রচুর সুনামও অর্জিত হয়েছে। দিন-দিন বেড়ে চলেছে কর্মকাণ্ডের পরিসর। প্রাথমিক অবস্থায় পারিবারিক আয় থেকেই ট্রাস্টের ব্যয় নির্বাহ করা হত। পরবর্তীতে সরকার অনুদান ও অন্যান্য অনুদান আসতে থাকে।

কর্মজীবনে সন্তানদের সাফল্যে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি স্বরুপ রেশাতুন নাহার “রত্নগর্ভ মা” পদকে ভূষিত হয়েছেন।

.


© সুব্রত কুমার মুখার্জী, সামছউদ্দীন-নাহার ট্রাস্ট।